মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
সর্ব-শেষ হাল-নাগাদ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

ইতিহাস ও কার্যাবলি

বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যুৎখাত উন্নয়ন ও সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড (এপিএসসিএল) ২৮ জুন ২০০০ইং তারিখে কোম্পানি আইন ১৯৯৪ –এর অধীনে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানী হিসেবে নিবন্ধিত হয়। পরবর্তীতে ০১ মার্চ ২০০৩ইং তারিখে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানীতে রুপান্তর করা হয়। এপিএসসিএল –এর নিবন্ধন নং ৪০৬৩০ (২৩২৮)/২০০০। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং এপিএসসিএল এর মধ্যে ২২ মে ২০০৩ইং তারিখে স্বাক্ষরিত ১ম Provisional Vendor’s Agreement এর মাধ্যমে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন (এপিএস) কমপ্লেক্স -কে এপিএসসিএল -এর কাছে হস্তান্তর করা হয়। ০১ জুন ২০০৩ তারিখ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোম্পনীর সকল কার্যক্রম শুরু হয় এবং পাওয়ার স্টেশনের অপারেশন, সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কার্যক্রম সহ কোম্পানির সামগ্রিক কার্যক্রম ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নির্বাহী পরিচালক (প্রকৌশল), নির্বাহী পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ও নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) এর সমন্বয়ে গঠিত ব্যবস্থাপনার উপর ন্যস্ত করা হয়।

 

এপিএসসিএল এর অনুমোদিত শেয়ার মূলধনের পরিমাণ ৫০০০ কোটি টাকা, যা ১০ টাকা মূল্যের ৫০০ কোটি শেয়ারে বিভক্ত। বর্তমানে কোম্পানীর পরিশোধিত শেয়ার মূলধনের পরিমাণ ১২১৮.৭৬ কোটি টাকা। প্রাথমিক ভাবে কোম্পানীর পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ছিল দশ লক্ষ টাকা। গত ২২ মে ২০০৩ইং তারিখে স্বাক্ষরিত ১ম Provisional Vendor’s Agreement এর মাধ্যমে বাবিউবো’র নামে ৬৬১.৪০ কোটি টাকার শেয়ার বরাদ্দ করা হয়। পরবর্তীতে গত ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০ইং তারিখে স্বাক্ষরিত Final Vendor’s Agreement এর মাধ্যমে বাবিউবো’র নামে অতিরিক্ত ৫৫৭.২৬ কোটি টাকার শেয়ার বরাদ্দ করা হয়। বর্তমানে কোম্পানীর মোট শেয়ারের ৯৯.৯৯% বিপিডিবি এবং অবশিষ্ট শেয়ার অর্থ বিভাগ, পরিকল্পনা বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এর মালিকানায় রয়েছে।

 

তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য অবকাঠামোগত সুবিধা যেমনঃ নদী, ভারী সরঞ্জামাদি পরিবহন সুবিধা (সড়কপথ, রেলপথ ও নৌপথ), জ্বালানী উৎস (গ্যাস নেটওয়ার্ক) ইত্যাদি আবশ্যক সুবিধাসমূহ বিবেচনা করে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার “আশুগঞ্জ” উপজেলায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য একটি বিদেশী নির্মাণ কোম্পানির সাথে ১৯৬৬ সালে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ‘আশুগঞ্জ’ তিতাস গ্যাস ক্ষেত্রের কাছাকাছি এবং মেঘনা নদীর তীরে অবস্থিত বলে সে সময়ে দেশের সর্ববৃহৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্ধারিত হয়। মেঘনা রেলসেতুর উত্তর-পূর্ব দিকের ৩১১ একর জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে ১৯৬৬ সালে জার্মান সরকারের আর্থিক সহায়তায় আশুগঞ্জ তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ কাজ শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে মোট ১২৮ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন ২টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ১৯৬৮ সালে প্রধান যন্ত্রপাতিসমূহের স্থাপন কাজ শুরু হয় এবং ১৯৭০ সালের জুলাই মাসে ইউনিট দুটির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। উক্ত ২টি প্রকল্পের পাশাপাশি ভবিষ্যতে অন্য আরও ৩টি ইউনিট স্থাপনের জন্য কিছু অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়।

 

১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আশুগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্ট যুদ্ধবিদ্ধস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তীতে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে আশুগঞ্জ তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষমতা বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। তদানুযায়ী জার্মানির মেসার্স Lahmyer International কে আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত করা হয় এবং তারা বিদ্যুৎ কেন্দ্র সম্প্রসারণের সম্ভাব্যতা পর্যালোচনা শেষে প্রতিটি ১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন ৩টি ইউনিট (ইউনিট ৩, ৪ ও ৫) স্থাপনের পক্ষে মতামত প্রদান করে। IDA, KFW (German Govt.), কুয়েত, OPEC তহবিল ও ADB এর আর্থিক সহায়তায় এই ৩টি ইউনিট স্থাপন করা হয়। উল্লেক্ষ্য, ভিন্ন ভিন্ন দেশ ও সংস্থার আর্থিক সহায়তায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো স্থাপিত হওয়ায়,  বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সরঞ্জাম সমূহ ভিন্ন ভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। Turbo - জেনারেটরের অংশ সরবরাহ ও স্থাপন করে জার্মানির মেসার্স BBC (বর্তমান ABB) এবং বয়লার অংশ জাপানের IHI কোম্পানির তৈরি এবং সরবরাহ ও স্থাপনের কাজ করে জাপানের মেসার্স Mitsui and Co. অন্যান্য প্রধান যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং স্থাপন করে মেসার্স BBC (জার্মানি), মেসার্স IHI (জাপান), মেসার্স KDC (কোরিয়া) এবং মেসার্স PCC (কোরিয়া)। মেসার্স Lucky International (কোরিয়া) 230KV আশুগঞ্জ-ঘোড়াশাল সঞ্চালন লাইন স্থাপনের কাজ করে।

 

এই তিনটি ইউনিট পর্যায়ক্রমে ডিসেম্বর, ১৯৮৬ এবং মে, ১৯৮৭ -এ চালু করা হয়। ইউনিট ৩ ও ৪ স্থাপন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করার সময় ব্রিটিশ আর্থিক সহায়তায় একটি কম্বাইন্ড সাইকেল প্ল্যান্ট স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৫৬ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন ২টি গ্যাস টারবাইন এবং ৩৪ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন একটি স্টীম টারবাইন নিয়ে গঠিত কম্বাইন্ড সাইকেল প্ল্যান্টটির মোট ক্ষমতা ছিল ১৪৬ মেগাওয়াট । ইউনিটটির প্রধান যন্ত্রপাতি তৈরি এবং স্থাপনার কাজ করে ইংল্যান্ডের GEC কোম্পানি (বর্তমান ALSTOM,UK)। কম্বাইন্ড সাইকেল প্ল্যান্টটির জিটি-১, এসটি এবং জিটি-২ ইউনিট সমূহ পর্যায়ক্রমে ১৯৮২, ১৯৮৪ এবং ১৯৮৬ইং সালে চালু হয়।

 

সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী  জরুরী ভিত্তিতে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে ২০১০ সালে এপিএসসিএল সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। স্পেন ভিত্তিক স্বনামধন্য কোম্পানী TSK প্রকল্পটির ঠিকাদার হিসেবে কাজ করে। ৩০ এপ্রিল ২০১১ তারিখ থেকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়।

 

দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মোকাবিলায়, এপিএসসিএল ২০১৩ সালে আরও ৪টি জ্বালানি সাশ্রয়ী বৃহৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প (২২৫ মেগাওয়াট সিসিপিপি, ৪৫০ মেগাওয়াট সিসিপিপি (সাউথ), ৪৫০ মেগাওয়াট সিসিপিপি (নর্থ) ও ২০০ মেগাওয়াট মডিউলার) বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে। তন্মধ্যে, আশুগঞ্জ ২২৫ মেগাওয়াট সিসিপিপি প্রকল্পটি কোরিয়ান The Consortium of Hyundai Engineering Co., Ltd. and Daewoo International Corporation এর মাধ্যমে নির্মাণ করা হয়, যা ০৯ ডিসেম্বর ২০১৫ইং তারিখে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। বর্তমানে এই প্রকল্পের উৎপাদন ক্ষমতা ২২৩ মেগাওয়াট। ২০০ মেগাওয়াট মডিউলার প্রকল্পটি পিপিপি এর আওতায় দেশীয় স্বনামধন্য কোম্পানী ইউনাইটেড এ্যানার্জির সাথে যৌথভাবে United Ashuganj Energy Ltd. (UAEL) কোম্পানী গঠনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়, যা ০৮ মে ২০১৫ইং তারিখে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। বর্তমানে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ১৯৫ মোগাওয়াট। আশুগঞ্জ ৪৫০ মেগাওয়াট সিসিপিপি (সাউথ) প্রকল্পটি স্পেন ও সুইডেন ভিত্তিক স্বনামধন্য কোম্পানী The Consortium of Inelectra International AB, Sweden and TSK Electronica Electricidad S.A., Spain. কোম্পানী যৌথভাবে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইপিসি হিসেবে কাজ করে, যা ১৮ জুলাই ২০১৬ইং তারিখে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। বর্তমানে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ৩৮৩ মোগাওয়াট। আশুগঞ্জ ২২৫ মেগাওয়াট সিসিপিপি  ও আশুগঞ্জ ৪৫০ মেগাওয়াট সিসিপিপি (সাউথ) প্রকল্পদ্বয় ECA অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হয়। সর্বশেষ বাস্তবায়িত আশুগঞ্জ ৪৫০ মেগাওয়াট সিসিপিপি (নর্থ) প্রকল্পটি উন্নয়ন অংশীদারী সংস্থা ADB ও IDB এর যৌথ অর্থায়নে বাস্তায়িত হয়। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে স্পেন ভিত্তিক কোম্পানী The Consortium of Technicas Reunidas S.A & TSK Electronica Y Electricidad S.A, Spain যৌথভাবে ইপিসি হিসেবে কাজ করে, যা জুন,২০১৭ই এ বাণিজ্যিকভাবে চালু করা হয়। বর্তমানে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ৩৮৬ মোগাওয়াট। ইতোমধ্যে কারিগরী আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ায় ইউনিট ১ এবং ইউনিট ২ কে অবসর প্রদান করা হয়েছে। বর্তমানে এপিএসসিএল-এর চলমান ৮টি ইউনিটের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১৬৯০ মেগাওয়াট।

 

সরকারে জ্বালানী বহুমূখীকরণ উদ্যোগের আওতায়, এপিএসসিএল গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি নির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এই উদ্দেশ্যে, এপিএসসিএল পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়ায় ‘কলাপাড়া ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র’ নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করে। বর্তমানে উক্ত প্রকল্পের ৯২৫.৫০ একর ভূমি অধিগ্রহণের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়াও, স্বাধীনতার পূর্বে স্থাপিত ২টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও ১ম কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্ল্যান্টটির লাইফ টাইম শেষ হওয়ায়, বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই সাথে উক্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জায়গায় নতুন জ্বালানি সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এপিএসসিএল এর ১ম কম্বাইন্ড সাইকেল ও তৎসংলগ্ন এলাকায় আশুগঞ্জ ৪০০ মোগওয়াট সিসিপিপি (পূর্ব) নির্মাণ প্রকল্পের কার্যক্রম গত জুলাই, ২০১৮ইং তারিখে শুরু হয়, যা ২০২১ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসবে। এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যায় ২৯৩১ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারী সংস্থা ADB , IDB ও GoB বর্ণিত প্রকল্পে অর্থায়ন করছে। চায়নাভিত্তিক CNTIC-CCOEC Consortium প্রকল্পের নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করছে। এপিএসসিএল এর ভবীষ্যত কর্মপরিকল্পনায় পুরাতন বিদ্যুৎ কেন্দ্র সমূহের (ইউনিট ১ থেকে ৫) স্থলে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে। এছাড়া, বিকল্প জ্বালানীভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হিসেবে ১০০ মেগাওয়াট গ্রীড টাইড সোলার পার্ক স্থাপনের লক্ষ্যে উপযুক্ত স্থান নির্বাচনের কাজ চলছে।

 

এপিএসসিএল কর্তৃক বাস্তবায়িত বিদ্যুৎ কেন্দ্রেগুলোর প্রধান জ্বালানী হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহৃত হয়। বাষ্প তৈরি এবং শীতলীকরণের জন্য মেঘনা নদীর পানি ব্যবহার করা হয়। শীতলীকরণের জন্য ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ডিসচার্জ চ্যানেল দিয়ে নদীতে ছাড়া হয়। এখানে বিশেষভাবে উল্লেক্ষ্য যে, শুষ্ক মৌসুমে ডিসচার্জ চ্যানেলের পানি একটি স্লুইস গেট –এর সাহায্যে আশুগঞ্জ- সরাইলের এর বিশাল এলাকার প্রায় ৩৬,০০০ একর জমি সেচের জন্য ব্যবহার করা হয়।


Share with :

Facebook Facebook